ZAMIL ACADEMY জ্ঞান ও আলোর সন্ধানে
বুকমার্ক যুক্ত হয়েছে!
আল-ইসরা ওয়াল মিরাজ

ইসরা ও মিরাজ এর বিস্তারিত ইতিহাস

"প্রিমিয়াম সেবা পেতে আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন"

মহিমান্বিত মিরাজের পর্যায়ক্রমিক সফর

নিচের প্রতিটি স্টেশনে ক্লিক করে সেই বিশেষ সফর ও মোজেজার বর্ণনা জানুন

পর্যায় ০১

মক্কা মোকাররমা ও বক্ষ বিদীর্ণ করার অলৌকিক ঘটনা

মিরাজের শুভ রাত্রিটি শুরু হয়েছিল মক্কার হাতিমে কাবা অথবা উম্মে হানির গৃহ থেকে। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিদ্রা ও জাগরণের মধ্যবর্তী অবস্থায় ছিলেন, এমতাবস্থায় হযরত জিবরাইল (আ.) ও মিকাইল (আ.) আগমন করলেন। এরপর হাতিমে কাবায় নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বক্ষ বিদীর্ণ করা হলো এবং তাঁর পবিত্র অন্তর জমজমের পানিতে ধুয়ে ঈমান ও হিকমত দিয়ে পূর্ণ করা হলো। এরপরই তাঁর সামনে পেশ করা হলো আলোর চেয়েও দ্রুতগামী এক অলৌকিক বাহন - 'বুরাক'।

* বুখারী ও মুসলিম শরীফের বিশ্বস্ত বর্ণনা অনুসারে
CHAPTER 01

১. মিরাজের পরিচয়

হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নবুওয়াতী জীবনের ইতিহাসের সর্বাধিক বিষ্ময়কর, অলৌকিক ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হলো মিরাজ। এটি কোনো রূপক বা স্বপ্ন ছিল না, বরং স্বশরীরে পরম দয়ালু আল্লাহ তাআলার বিশেষ মেহমান হিসেবে ঊর্ধ্বজগতে পরিভ্রমণ করার এক অনন্য মোজেজা। রাসুলুল্লাহ (সা.) এক বিশেষ রজনীতে জাগ্রত অবস্থায় জিবরাইল (আ.)-এর সাথে বোরাক নামক অলৌকিক বাহনে চড়ে মক্কা মুকাররমা থেকে বাইতুল মুকাদ্দাস হয়ে সপ্ত আসমান অতিক্রম করেন এবং আরশে আজিম স্পর্শ করে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের পরম সান্নিধ্য লাভ করেন। এই মহিমান্বিত সফর ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে রহস্যময় এবং প্রামাণ্য অলৌকিক ঘটনা যা সকল মানুষের ধারণাতীত।

CHAPTER 02

২. ইসরা ও মিরাজের অর্থ

ভাষাতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই অলৌকিক সফরের দুটি স্বতন্ত্র অংশ রয়েছে:

  • ইসরা (الإسراء): শব্দটির আভিধানিক অর্থ হলো 'রাত্রিকালীন ভ্রমণ'। পারিভাষিক অর্থে মহানবী (সা.)-এর মক্কার মসজিদুল হারাম থেকে ফিলিস্তিনের বায়তুল মুকাদ্দাস (মসজিদুল আকসা) পর্যন্ত রাত্রিবেলা অলৌকিক বাহন বোরাকে করে ভ্রমণ করাকে 'ইসরা' বলা হয়। পবিত্র কুরআনের সূরা বনী ইসরাইলের ১ম আয়াতে এই অংশের বর্ণনা রয়েছে।
  • মিরাজ (المعراج): মিরাজ শব্দের আভিধানিক অর্থ 'ঊর্ধ্বগমনের সিঁড়ি বা সোপান'। ইসলামী পরিভাষায় বায়তুল মুকাদ্দাস থেকে শুরু করে সপ্ত আসমান, সিদরাতুল মুনতাহা পার হয়ে আরশে আজিম ও মহান আল্লাহর দিদার লাভ করার জন্য ঊর্ধ্বজগতে যে অলৌকিক সফর সংঘটিত হয়েছিল তাকে 'মিরাজ' বলা হয়।
CHAPTER 03

৩. মিরাজের পটভূমি

নবুওয়াতের দশম বর্ষে মক্কায় ইসলামের দাওয়াতী কাজ এক অত্যন্ত কঠিন ও নাজুক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিল। একদিকে মক্কার কাফেরদের সীমাহীন অত্যাচার, অন্যদিকে কুরাইশদের পক্ষ থেকে নবী পরিবার ও মুসলমানদের ওপর দীর্ঘ ৩ বছরের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বয়কট (শিয়াবে আবী তালিবের বন্দিদশা) সবেমাত্র শেষ হয়েছিল। মুসলমানরা যখন চরম অনাহার ও মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছিলেন, ঠিক তখনই রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় দুই অভিভাবক ও সান্ত্বনাদানকারীকে হারান।

CHAPTER 04

৪. আমুল হুযুনের পরবর্তী পরিস্থিতি

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর চাচা আবু তালিব এবং প্রিয়তমা স্ত্রী উম্মুল মুমিনীন হযরত খাদিজা (রা.)-এর ইন্তেকালের কারণে এই বছরটিকে ইতিহাসে "আমুল হুযুন" (عام الحزن) বা "দুঃখের বছর" হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। চাচা আবু তালিবের মৃত্যুর পর কাফেরদের অত্যাচারের মাত্রা বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। আশাহত হয়ে নবীজি (সা.) তায়েফে ইসলামের দাওয়াত দিতে গেলে সেখানে রক্তাক্ত ও অপমানিত হন। এই নিদারুণ মানসিক ও শারীরিক কষ্টের সময়ে মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় হাবীবকে সান্ত্বনা দিতে এবং নিজের অপার কুদরত স্বচক্ষে প্রদর্শন করার মাধ্যমে তাঁর হৃদয়কে দ্বিগুণ শক্তিশালী করতে ঊর্ধ্বজগতে ভ্রমণের দাওয়াত দেন।

CHAPTER 05

৫. মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসা

পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:

"পবিত্র মহান সেই সত্ত্বা, যিনি তাঁর বান্দাকে রাতে ভ্রমণ করিয়েছিলেন মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসা পর্যন্ত, যার চারপাশকে আমি বরকতময় করেছি, যাতে আমি তাকে আমার নিদর্শনসমূহ দেখাতে পারি..." (সূরা বনী ইসরাইল: ১)

মক্কার মসজিদুল হারাম থেকে প্রায় ১২০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত জেরুজালেমের মসজিদুল আকসা বা বায়তুল মুকাদ্দাস। মিরাজের প্রথম ভাগে রাসূলুল্লাহ (সা.) সেখানে উপস্থিত হন এবং সকল নবী-রাসূলদের একত্রিত করা হয়। মহানবী (সা.) ইমাম হিসেবে সকল নবীর ইমামতি করে দুই রাকাত সালাত আদায় করেন। এর মাধ্যমেই তিনি লাভ করেন "ইমামুল মুরসালীন" (রাসুলদের ইমাম) ও "সাইয়্যেদুল আম্বিয়া" এর অনন্য মর্যাদা।

CHAPTER 06

৬. বুরাকের পরিচয়

মিরাজের বাহন হিসেবে জিবরাইল (আ.) জান্নাত থেকে 'বুরাক' (البُراق) নামক একটি অতিপ্রাকৃতিক জীব নিয়ে এসেছিলেন। হাদীসের বর্ণনা অনুযায়ী, এটি ছিল গাধার চেয়ে বড় এবং খচ্চরের চেয়ে ছোট ধবধবে সাদা রঙের এক বাহন। এর গতি ছিল অত্যন্ত বিষ্ময়কর—তার চোখের দৃষ্টি যেখানে গিয়ে শেষ হতো, সেখানেই সে তার প্রথম কদম ফেলতো। 'বুরাক' শব্দটি মূলত আরবি 'বারকুন' (বিদ্যুৎ) থেকে এসেছে, যা এর বিদ্যুদ্বেগী আলোর গতির দিকে ইঙ্গিত করে। রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন প্রথম এতে আরোহণ করতে যান, বাহনটি কিছুটা চঞ্চলতা প্রকাশ করে। তখন জিবরাইল (আ.) বলেন, "হে বুরাক! শান্ত হও। আল্লাহর কসম, আজ পর্যন্ত মুহাম্মাদ (সা.)-এর চেয়ে উত্তম কোনো সৃষ্টি তোমার পিঠে চড়েনি।" এ শুনে বোরাক লজ্জিত হয়ে ঘামতে শুরু করে ও শান্ত হয়।

CHAPTER 07

৭. বিভিন্ন নবীর সাথে সাক্ষাৎ

ঊর্ধ্বাকাশে ভ্রমণের সময় রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রতি আসমানে পূর্ববর্তী প্রখ্যাত নবীগণের সাথে সাক্ষাৎ ও কুশল বিনিময় করেন। প্রতিটি আসমানের ফেরেশতারা নবীজি (সা.)-কে সাদর অভ্যর্থনা জানান। এই নবীগণের আত্মিক উপস্থিতি ও তাঁদের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় মহানবী (সা.)-কে এক পরম আত্মিক স্বস্তি প্রদান করেছিল, কারণ পূর্বে এই সকল নবীও তাঁদের নিজ নিজ জাতির কাছে দুঃখ-কষ্ট ও নির্যাতনের সম্মুখীন হয়েছিলেন।

CHAPTER 08

৮. সাত আসমানের বিবরণ

সপ্ত আকাশের প্রতিটি স্তরে নবীজি (সা.) যাদের সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন, তাদের বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:

১ম আসমান থেকে ৩য় আসমান

  • প্রথম আসমান: মানবজাতির আদি পিতা হযরত আদম (আ.)-এর সাথে সাক্ষাৎ।
  • দ্বিতীয় আসমান: হযরত ঈসা (আ.) এবং হযরত ইয়াহইয়া (আ.)-এর সাথে সাক্ষাৎ।
  • তৃতীয় আসমান: পৃথিবীর অর্ধেক সৌন্দর্যের অধিকারী হযরত ইউসুফ (আ.)-এর সাথে সাক্ষাৎ।

৪র্থ আসমান থেকে ৭ম আসমান

  • চতুর্থ আসমান: সুউচ্চ মর্যাদার অধিকারী হযরত ইদরীস (আ.)-এর সাথে সাক্ষাৎ।
  • পঞ্চম আসমান: বনী ইসরাইলের প্রিয় নবী হযরত হারুন (আ.)-এর সাথে সাক্ষাৎ।
  • ষষ্ঠ আসমান: অশ্রুভারাক্রান্ত নয়নে শুভকামনা জানানো হযরত মুসা (আ.)-এর সাথে সাক্ষাৎ।
  • সপ্তম আসমান: বায়তুল মামুরে পিঠ হেলান দিয়ে বসা জাতির পিতা হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর সাথে সাক্ষাৎ।
CHAPTER 09

৯. সিদরাতুল মুনতাহা

সপ্তম আসমানের ওপর অবস্থিত 'সিদরাতুল মুনতাহা' (سدرة المنتهى) তথা 'প্রান্তবর্তী বরই বৃক্ষ'। সৃষ্টিজগতের জ্ঞান ও সীমানা এই স্থানে এসে শেষ হয়ে যায়। জিবরাইল (আ.)-সহ কোনো ফেরেশতারই এর বাইরে যাওয়ার অনুমতি নেই। রাসুলুল্লাহ (সা.) সেখানে জিবরাইল (আ.)-কে তাঁর আসল স্বরূপে (৬০০ পাখা সম্বলিত রূপ) দ্বিতীয়বারের মতো প্রত্যক্ষ করেন। এই বরই বৃক্ষটি এমন এক স্বর্গীয় আলো ও ঐশ্বরিক রঙ দ্বারা আবৃত ছিল যা কোনো মানুষের পক্ষে বর্ণনা করা অসম্ভব। এখানে এসে জিবরাইল (আ.) তাঁর সীমানায় থমকে দাঁড়ান এবং বলেন, "এর পরে যদি আমি এক ইঞ্চিও অতিক্রম করি, তবে আল্লাহর নূরের তীব্রতায় আমি পুড়ে ছাই হয়ে যাবো।"

CHAPTER 10

১০. জান্নাত ও জাহান্নামের দৃশ্য

মিরাজ সফরে রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জান্নাত ও জাহান্নামের চাক্ষুষ চিত্র দেখানো হয়েছিল। তিনি জান্নাতের অফুরন্ত নিয়ামত, হুর-গিলমান এবং কওসরের ঝর্ণা প্রত্যক্ষ করেন। অপরদিকে, জাহান্নামে বিভিন্ন অপরাধের শাস্তিপ্রাপ্ত পাপীদের ভয়াবহ অবস্থাও দেখেন:

  • পরনিন্দাকারী: যারা অপরের গীবত ও পরনিন্দা করতো, তাদের তামার নখ দিয়ে নিজেদের মুখ ও বুক ক্ষতবিক্ষত করতে দেখেন।
  • সূদখোর: সুদখোরদের পেটগুলোকে একেকটি ঘরের মতো বিশাল এবং তাতে বিষাক্ত সাপ কিলবিল করতে দেখেন।
  • ইয়াতীমের সম্পদ আত্মসাতকারী: যারা এতিমের মাল অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করতো, তাদের মুখ দিয়ে আগুনের পাথর ঢুকিয়ে নিচে বের হতে দেখেন।
CHAPTER 11

১১. আল্লাহর সাথে বিশেষ সম্মাননা

সিদরাতুল মুনতাহা অতিক্রম করার পর রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জন্য 'রফরফ' নামক আরেকটি বিশেষ জান্নাতী সওয়ারী পেশ করা হয়। এর মাধ্যমে তিনি সৃষ্টিজগতের সর্বোচ্চ স্তর আরশে আজীমের নিকটবর্তী হন। সেখানে পৌঁছানোর পর সমস্ত পর্দা উঠে যায় এবং রাসুলুল্লাহ (সা.) সৃষ্টিজগতের সমস্ত মাধ্যম ছাড়াই সরাসরি তাঁর পরম প্রতিপালক মহান আল্লাহর সাথে কথা বলেন। এই মিলন ও সম্মাননা ছিল ভাষায় প্রকাশের অতীত। সেখানে আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় হাবীবকে তিনটি বিশেষ উপহার দেন: ১. পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ সালাত, ২. সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত (আমানার রাসুলু...), এবং ৩. শিরকমুক্ত উম্মতের কবিরা গুনাহ মাফের ঘোষণা।

CHAPTER 12

১২. পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরজ

আল্লাহ তাআলা প্রথমে উম্মতে মুহাম্মাদীর ওপর ৫০ ওয়াক্ত সালাত ফরজ করেছিলেন। ফেরার পথে ষষ্ঠ আসমানে হযরত মুসা (আ.)-এর সাথে সাক্ষাৎ হলে তিনি বলেন, "আপনার উম্মত অত্যন্ত দুর্বল, তারা ৫০ ওয়াক্ত সালাত আদায় করতে পারবে না। আপনি আল্লাহর দরবারে ফিরে যান এবং সালাত কমানোর আবেদন করুন।" মুসা (আ.)-এর পরম পরামর্শে রাসুলুল্লাহ (সা.) বারবার আল্লাহর দরবারে ফিরে যান এবং প্রতিবারে সালাত হ্রাস করা হয়। অবশেষে তা ৫ ওয়াক্তে এসে স্থির হয়। মহান আল্লাহ ঘোষণা করেন, "আমার দরবারে কথার কোনো পরিবর্তন হয় না। যে ব্যক্তি নিষ্ঠার সাথে এই পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করবে, তাকে ৫০ ওয়াক্ত সালাতের সমপরিমাণ সওয়াব দান করা হবে।"

CHAPTER 13

১৩. মক্কার লোকদের প্রতিক্রিয়া

সফর শেষে পরদিন সকালে রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন কাবা চত্বরে বসে মিরাজের অলৌকিক ঘটনা বর্ণনা করলেন, তখন মক্কার কাফেররা পরিহাস ও ঠাট্টা-বিদ্রূপে ফেটে পড়ে। কারণ মক্কা থেকে জেরুজালেমের যাতায়াতে এক মাসেরও বেশি সময় লাগতো, তা কীভাবে এক রাতে যাওয়া-আসা এবং সপ্ত আসমান পরিভ্রমণ সম্ভব! তারা রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে মিথ্যা প্রতিপন্ন করতে বায়তুল মুকাদ্দাসের দরজা, জানালা এবং স্তম্ভের খুঁটিনাটি বিবরণ জানতে চায় (কারণ তারা জানত রাসূল কখনো সেখানে যাননি)। মহান আল্লাহ তখন বায়তুল মুকাদ্দাসের অবিকল চিত্র রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর চোখের সামনে তুলে ধরেন এবং তিনি দেখে দেখে হুবহু নিখুঁত বর্ণনা দেন, যা শুনে কুরাইশরা চরম বিস্মিত হয় কিন্তু হিদায়াত থেকে বঞ্চিত থাকে।

CHAPTER 14

১৪. আবু বকর (রা.)-এর ভূমিকা

কাফেরদের একটি দল পরম উল্লাসে হযরত আবু বকর (রা.)-এর কাছে ছুটে গিয়ে বললো, "তুমি কি শুনেছ, তোমার বন্ধু মুহাম্মাদ নাকি দাবী করছে সে এক রাতেই বায়তুল মুকাদ্দাস ঘুরে এসেছে এবং আসমান পাড়ি দিয়েছে!" হযরত আবু বকর (রা.) বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে জিজ্ঞেস করলেন, "তিনি কি সত্যিই এ কথা বলেছেন?" তারা বললো, "হ্যাঁ।" তখন আবু বকর (রা.) উত্তর দিলেন, "যদি তিনি এ কথা বলে থাকেন, তবে তা শতভাগ সত্য। আমি তো তাঁর কাছে আসা আসমানী ওহীর খবর সকাল-সন্ধ্যায় কোনো প্রশ্ন ছাড়াই বিশ্বাস করি, তবে এটি কেন করব না!" তাঁর এই অটল ও অভূতপূর্ব বিশ্বাসের কারণে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে 'আস-সিদ্দীক' (চরম সত্যবাদী) উপাধিতে ভূষিত করেন।

CHAPTER 15

১৫. মিরাজের শিক্ষা

মিরাজের অলৌকিক ঘটনা থেকে মানবজাতি বহু গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা লাভ করে:

  • কঠিন সময়ে ধৈর্য ও আস্থা: তায়েফে চরম লাঞ্ছনা ও দুঃখের পরেই মিরাজের মহা পুরস্কার প্রমাণ করে যে, দুঃখের পরেই অবশ্যই সুখ আসে এবং আল্লাহর ওপর অটল বিশ্বাসীদের উত্তম প্রতিদান নিশ্চিত।
  • সালাতের গুরুত্ব: অন্যান্য ইবাদত ওহীর মাধ্যমে পৃথিবীতে অবতীর্ণ হলেও সালাত ফরজ করতে স্বয়ং রাসূলকে ঊর্ধ্বজগতে ডেকে নেওয়া হয়েছিল। এটি সালাতের অনন্য মহিমাকে নির্দেশ করে।
  • অদৃশ্য জগতের সত্যতা: জান্নাত, জাহান্নাম ও আরশ কোনো তাত্ত্বিক বিষয় নয়, বরং বাস্তব সত্য যা রাসূল (সা.) নিজের চোখে দেখে এসেছেন।
CHAPTER 16

১৬. ধর্মীয় গুরুত্ব

ধর্মীয় দিক থেকে মিরাজ হলো মুমিনের ঈমানের কষ্টিপাথর। এটি অন্ধবিশ্বাসের বিষয় নয়, বরং পরম সত্ত্বার ওপর বুদ্ধিবৃত্তিক সমর্পণের চরম পরীক্ষা। মিরাজের মাধ্যমেই ইসলাম ধর্মকে একটি চূড়ান্ত প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয় দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের বিধানের মাধ্যমে। এছাড়াও, মসজিদুল হারাম ও মসজিদুল আকসা-র মধ্যে এক অবিচ্ছেদ্য আধ্যাত্মিক সুতো গেঁথে দেওয়া হয় মিরাজের মাধ্যমে, যা আজ পর্যন্ত মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে সংবেদনশীল ধর্মীয় ও ভূ-রাজনৈতিক কেন্দ্রবিন্দু।

CHAPTER 17

১৭. আধ্যাত্মিক গুরুত্ব

আধ্যাত্মিক জগতের মহাসাধক ও উলামায়ে কেরাম বলেন—"আস-সালাতু মিরাজুল মুমিনীন" (الصلاة معراج المؤمنين) অর্থাৎ "সালাত হলো মুমিনের মিরাজ"। রাসূলুল্লাহ (সা.) স্বশরীরে আরশে আজিমে গিয়ে আল্লাহর পরম সান্নিধ্য পেয়েছিলেন, আর একজন সাধারণ মুমিন বান্দা দৈনিক পাঁচবার সালাতে সিজদাবনত হয়ে তাঁর হৃদয়ের আরশে আল্লাহর সাথে সরাসরি সংযোগ স্থাপন ও পরম শান্তি লাভ করতে পারে। মিরাজ আমাদের শেখায় যে, মানুষ কেবল মাটির দেহ নয়, বরং তার আত্মা অসীম ঊর্ধ্বজগতের দিকে ধাবিত হতে সক্ষম যখন সে নিজেকে সকল পাপ-পঙ্কিলতা থেকে মুক্ত করে আল্লাহর ভালোবাসায় নিমজ্জিত করে।